:: সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্রপতি ::

Posted by fahdzmn on on Nov. 3, 2012, 2:03 p.m.  

সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্রপতি

প্রথম ছবিটা ভালো করে দেখুন। মেঠো পথের ধারে সাধারণ পোশাকে মাথা চুলকাচ্ছেন এক বয়োবৃদ্ধ ভদ্রলোক। সম্ভবত কোনো ব্যাপার নিয়ে চিন্তিত। এক মনে সেটা নিয়েই ভাবছেন হয়তো। আচ্ছা, এই ভদ্রলোক কে হতে পারেন, সে সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা আছে? মফস্বলের ছোট ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ কোনো চাকরিজীবী, এমনটাই হয়তো ভাবছেন আপনি। কিন্তু জেনে অবাক হবেন, এই ভদ্রলোক লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট জোসে মুজিকা। এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র প্রেসিডেন্ট তিনি।

এই মানবতাবাদী রাষ্ট্রপ্রধান জীবনে যা আয় করেছেন আক্ষরিক অর্থে তার সবটাই তিনি দান করেছেন দেশের দুস্থ মানুষের কল্যাণের জন্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা যেখানে নিজের সম্পদ গোছানোয় ব্যস্ত, সেখানে মুজিকার সম্পদ বলতে আছে শুধু একটি গাড়ি। আমাদের দেশের একজন সাধারণ সংসদ সদস্যের যেখানে কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি থাকে, সেখানে উরুগুয়ের এই প্রেসিডেন্ট চলাচল করেন ১৯৮৭ সালের ভিডবি্লউ বিটেল মডেলের গাড়িতে। এ ধরনের গাড়ি আজ থেকে ৩০ বছর আগে আমাদের দেশ থেকে উঠে গেছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বাড়তি খরচ হবে বলে প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ধারিত সরকারি বাড়ি বা গাড়ি, কোনোটাই ব্যবহার করেন না মুজিকা। রাজধানী মন্টিভিডিওর পাশে স্ত্রীর মালিকানাধীর ছোট্ট বাড়িতে থাকেন তিনি। সেখান থেকে প্রতিদিন অফিসে আসেন। এক শীত ঋতুতে তাপমাত্রা ব্যাপক কমার আশঙ্কা দেখা দিলে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টারা তাকে প্রেসিডেন্টশিয়াল প্যালেস 'সুয়ারেজ ওয়াই রেয়েসে' ওঠার পরামর্শ দেন। কিন্তু সেটাও প্রেসিডেন্ট প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানদের মতো নিরাপত্তারক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা করেন না মুজিকা। আর দশজন সাধারণ নাগরিকের মতো রাস্তায় বের হন। ট্রাফিক সিগন্যাল পড়লে থেমে যান। অপেক্ষা করেন সবুজ বাতি জ্বলার। প্রেসিডেন্ট হিসেবে জোসে মুজিকা প্রতি মাসে বেতন পান ১০ লাখ ২০ হাজার টাকা (১২ হাজার ৫০০ ডলার)। সেখান থেকে মাত্র ১ লাখ টাকার মতো (১ হাজার ২৫০ ডলার) রেখে, বাকি টাকাটা দুস্থদের মধ্যে বিলিয়ে দেন তিনি। এ ব্যাপারে এক স্প্যানিশ টিভি চ্যানেলে প্রশ্ন করা হলে মুজিকা বলেন, 'এই টাকায় বেশ ভালো আছি। আসলে আমাকে এর মধ্যেই ভালো থাকতে হয়। কারণ অসংখ্য উরুগুইয়ান আমার চেয়ে খারাপ অবস্থায় আমার আশপাশেই বাস করে।' অনেকেই ভাবতে পারেন, মাসে ১ লাখ টাকায় প্রেসিডেন্টের ভালোভাবেই চলে যাওয়ার কথা। তাদের জন্য বলছি, উরুগুয়েতে সাধারণ খরচ আমাদের দেশের তুলনায় অনেক বেশি। যেখানে ১ কেজি সাধারণ চাল ১৪০ টাকা, এক ডজন ডিম ১৮০ টাকা, ১ কেজি মুরগি ৬৩৩ টাকা, ১ মিনিট লোকাল মোবাইল কল খরচ ২৬ টাকা, ১ লিটার পেট্রল ১৪৪ টাকা, ১ মাসের ফিটনেস ক্লাবের খরচ ৪ হাজার টাকা, তিন বেডরুমের একটি সাধারণ ফ্ল্যাটের ভাড়া ৭৭ হাজার টাকা_ সেখানে ১ লাখ টাকায় মাস পার করা কঠিন ব্যাপার। আর এমনটা যদি ঘটে একজন প্রেসিডেন্টের জীবনে, তাহলে তার জন্য ব্যাপারটা শুধু কঠিনই নয়, অনেকটা দুঃসাধ্যও বটে।

অনেক বছর এক সঙ্গে থাকার পর (লিভ টুগেদার) ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট মুজিকা লুসিয়া তপোলান্সকি নামে একজন রাজনীতিবিদকে বিয়ে করেন। স্বামীর মতাদর্শের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন লুসিয়া। উরুগুয়ের সিনেটর হওয়ার পরও সংসার চালানোর জন্য তাকে নিজের ছোট্ট খামারে ফুলের চাষ করতে হয়। প্রেসিডেন্ট নিজেও চাষের ব্যাপারে তাকে সাহায্য করেন। 'গাছে সার দেওয়া, ক্ষেত নিড়ানো থেকে শুরু করে ফুল তোলা_ সব কাজেই মুজিকা সমান পারদর্শী' জানিয়েছেন লুসিয়া। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এই দম্পত্তির কোনো ছেলেমেয়ে নেই। মুজিকা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন না। ১৯৩৫ সালের ২০ মে এক সাধারণ পরিবারে মুজিকা জন্মগ্রহণ করেন। ষাটের দশকের শুরুর দিকে 'টুপামারোস আরবান বিবেল মুভমেন্ট' নামের এক সদ্য প্রতিষ্ঠিত সশস্ত্র গেরিলা দলে যোগদান করেন তিনি। এ দলটি কিউবান বিপ্লবে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজ দেশে তেমনই কিছু করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। ফলে সামরিক জান্তা সরকারের রোষানলে পড়ে ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত জেলে বন্দি ছিলেন মুজিকা। ১৯৮৫ সালে উরুগুয়ে থেকে সামরিক শাসন উচ্ছেদ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর জেল থেকে ছাড়া পান তিনি। নিজ দেশে এই বামপন্থী গেরিলা নেতা খুবই জনপ্রিয়। সেখানে সবাই তাকে 'পেপে' নামে ডাকে। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লাকালেকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। ২০১০ সালের ১ মার্চ থেকে উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এর আগে ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত উরুগুয়ের কৃষি, মৎস্য ও পশুসম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

Daily Shamakal| শনিবার | ৩ নভেম্বর ২০১২ | ১৯ কার্তিক ১৪১৯ | ১৭ জিলহজ ১৪৩৩

You are not a follower
Follow?
This post was billed under the category Politics and Location
 Tags:  poor president